ঢাকা , শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ , ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুড়িগ্রামে মামলার হাজিরার টাকা না পাওয়ায় অসহায় বৃদ্ধার বুকে লাথি মারলেন এডভোকেট

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৭-১৭ ২১:২২:৪৪
কুড়িগ্রামে মামলার হাজিরার টাকা না পাওয়ায় অসহায় বৃদ্ধার বুকে লাথি মারলেন এডভোকেট কুড়িগ্রামে মামলার হাজিরার টাকা না পাওয়ায় অসহায় বৃদ্ধার বুকে লাথি মারলেন এডভোকেট
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-

মেয়ের সংসার বাঁচাতে, মেয়ের ওপর বছরের পর বছর চলা নির্যাতনের বিচার চাইতে ঘর ছেড়েছিলেন প্রায় ৭০ বছরের অসহায় বৃদ্ধা জায়দা খাতুন। শেষ সম্বল বিক্রি করেছেন, মানুষের কাছে হাত পেতে টাকা ধার করেছেন, নৌকায় চড়ে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী থেকে কুড়িগ্রাম আদালতে ছুটে এসেছেন-শুধু একটি আশায়, "বিচার পাবেন।" কিন্তু সেই বিচার চাইতে এসেই প্রতারণা, অপমান আর শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ এই বৃদ্ধা মায়ের। লিখিত অভিযোগে মোছাঃ জায়দা খাতুন উল্লেখ করেন, মেয়ে মোছাঃ সুমিনা খাতুনের ওপর স্বামীর নির্যাতনের ঘটনায় ২০২৫ সালে রৌমারী আমলি আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন তিনি।

মামলাটি পরিচালনার দায়িত্ব দেন কুড়িগ্রাম আইনজীবী সমিতির সদস্য এডভোকেট মোঃ মিজানুর রহমানের ওপর। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মামলার বিভিন্ন তারিখ সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে এবং নানা অজুহাতে তার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে অন্যের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য জানতে পেরে সবকিছু যেন ভেঙে পড়ে তার সামনে। সর্বশেষ গত ১৫ জুলাই মামলার নির্ধারিত তারিখে আবারও ধারদেনা করে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রৌমারী থেকে নৌকাযোগে কুড়িগ্রাম আদালতে আসেন তিনি। অভিযোগ অনুযায়ী, আইনজীবীর চেম্বারে গেলে আবারও ২ হাজার টাকা দাবি করেন এডভোকেট মোঃ মিজানুর রহমান ও তার মহুরি মোঃ আক্তার হোসেন। বৃদ্ধা পূর্বে নেওয়া টাকার হিসাব চাইলে ক্ষিপ্ত হয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে মেয়ে সুমিনা খাতুন প্রতিবাদ করলে তাকে ধাক্কা দেওয়া হয়। মেয়েকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে বৃদ্ধা মোছাঃ জায়দা খাতুনের বুকে পরপর দুই দফা লাথি মারা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। মায়ের সামনে মেয়ের কান্না, আর মেয়ের সামনে বৃদ্ধা মায়ের অপমান—এই দৃশ্য আদালতপাড়ায় উপস্থিত অনেকের মনকেও ভারী করে তোলে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার পর বিচার চেয়ে তিনি কুড়িগ্রামের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, কুড়িগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ এবং সদর থানায় পৃথক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এতেই শেষ নয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, পরে কুড়িগ্রাম আইনজীবী সমিতিতে অভিযোগ দিতে গেলে অভিযোগ গ্রহণের জন্যও ২ হাজার টাকা দাবি করা হয়। সেই টাকা জোগাড় করতে না পেরে চোখের পানি নিয়েই বাড়ি ফিরে যান অসহায় এই বৃদ্ধা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মোছাঃ জায়দা খাতুন বলেন, "আমি গরিব মানুষ। মেয়ের বিচার চাইতে গিয়ে পথে পথে ঘুরছি। ধার করে আদালতে আসি। এখন অভিযোগ করতেও যদি টাকা লাগে, তাহলে আমাদের মতো গরিব মানুষের বিচার কোথায়? আমরা কি মানুষ না?" অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার সময় মোঃ মাহবুবুর রহমান, মোঃ বিপ্লব ইসলাম ও মোছাঃ সুমিনা খাতুন উপস্থিত ছিলেন।


অভিযোগকারী দাবি করেন, তাদের সামনেই মা-মেয়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে এবং পরে তারাই তাদের উদ্ধার করেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মোঃ মাহবুবুর রহমান বলেন, একজন আইনজীবি টাকার জন্য কিভাবে বৃদ্ধাকে লাথি মারতে পারেন? এদৃশ্য আমাকর দারুণভাবে ব্যথিত করেছে। এডভোকেট মোঃ মিজানুর রহমান কুড়িগ্রামের সমস্ত আইনজীবিদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। আমি আশা করি আইনজীবি সমিতি তার বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিবে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এডভোকেট মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, "আমি তাকে বুকে লাথি মারিনি, শুধু ধাক্কা দিয়েছি।" এ বিষয়ে চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিয়োজিত সাবেক জনৈক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, "আইন পেশা একটা মহান পেশা। অথচ আইনজীবি মোঃ মিজানুর রহমান মক্কেলের সাথে সবসময় চরম দুর্ব্যবহার করেন। একজন বৃদ্ধার বুকে লাথি মারা সত্যি অমানবিক।

এমন কর্মকান্ড কারণে তার লাইসেন্স বাতিল করা দরকার।" বয়সের ভারে ন্যুব্জ এক মায়ের চোখে ছিল শুধু একটি স্বপ্ন—মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার। কিন্তু সেই পথেই যদি তাকে অপমান, প্রতারণা আর নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে ফিরতে হয়, তাহলে প্রশ্ন জাগে—গরিব মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের দরজা কি সত্যিই সমানভাবে খোলা.?

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ